হৃদয়ের আকুতি

প্রাণের প্রিয়তম!
তোমাকে আমি দেখিনি। তবু হৃদয়ের অনুভবে তোমায় দেখি প্রতিদিন। মর্মকরে তোমাকে অনুভব করি অনুক্ষণ। তোমার সুবাসিত তনুর গন্ধ পাই। খর্জুর বীথি ছোঁয়া মরু বাতাসে ভেসে বেড়ানো পুস্পঘ্রাণ থেকেও তীব্র সে সুগন্ধি, সে মনোলোভা সুবাস – আমাকে তন্ময় করে, উতলা-উদভ্রান্ত করে। তাই আমি আর ফুলের কাছে ঘ্রাণ নিতে যাই না।
মৃন্ময় মরু-সূর্য!
আমি দেখিনি তোমার জান্নাতি বিভাময় চেহারার উজ্জ্বল জ্যোতির শাণিত বিচ্ছুরণ। অথচ অনুভূতির আলোড়নে আলোড়নে সে স্বর্গ-প্রভা উদ্ভাসিত করে আমার আঁধার-কালো মনোরাজ্যকে। তোমার সেই অলৌকিক রূপালোক যেদিন থেকে আমার হৃদয়-উপত্যকা রওশন করেছে, সেদিন থেকে আমি আর পূর্ণিমার চাঁদ দেখি না। ইউসুফের (আ) কথা ভাবিনা।
জ্যোতির্ময় মরু-ভাস্কর!
তোমার বীণানিন্দিত কন্ঠস্বর – অনুভূতির জানালা খুলে উৎকর্ণ হয়ে শুনি প্রতিদিন।
কী মিষ্টি। কী মধুমাখা। কী হৃদয়গ্রাহী। তোমার সুললিত কন্ঠের সুর-লহরী আমার মনের গহনে যখন থেকে ঝংকৃত হয়েছে, তখন থেকে আমি আর শুনিনা – বিহঙ্গকন্ঠে অরণ্যসঙ্গীত। পরভৃতের সুরভরা গান। দাউদের (আ) প্রার্থনা।
নবী গো!
আমার স্বপ্নচারী বিবাগীমন, সন্ধানী তৃষ্ণ নয়ন অশ্রুর প্লাবনে ভেসে ভেসে মক্কা-মদিনার পথে-প্রান্তরে-প্রতি বালুকণায় খুঁজে ফেরে তোমার মনোরম পায়ের মোবারক ছাপ।
প্রিয়তম!
আজ মনের ক্যানভাসে স্মৃতির চিত্রপটে ভেসে ওঠে তোমার সিজদারত শির -যেখানে চাপানো হয়েছিল উটের পচা ভুরি। জেগে ওঠে নিঠুর তায়েফের শ্যামল প্রান্তর -যেখানে প্রস্তরঘায়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তোমার অভিযোগহীন দেহ। রুধিরাক্ত হয়েছে তোমার পুণ্যতনু। শোণিতধারায় আদ্র হয়েছে পবিত্র পাদুকা।
বিশ্বাস করো, কলজে ফেটে যাচ্ছে; যেন বুকের পঞ্জরে খঞ্জর বিঁধেছে।
বিশ্বাস করো, অশ্রু-প্রস্রবণ বইছে; মহাসাগরের অনন্ত পানিও যেন নির্জিত তার কাছে।
প্রিয়তম!
আজ হৃদয়পর্দায় জাগ্রত হয়ে ওঠে রক্তাক্ত উহুদের নির্মম স্মৃতি -ঘাতকের কালো হাতে যেখানে শহীদ হয়েছে তোমার পবিত্র দান্দান মোবারক। আজ মনমুকুরে ক্ষণে ক্ষণে তাজা হয়ে ওঠে শি’আবে আবী তালিব -গিরিসঙ্কটের করুণ কাহিনী। যেখানে খিন্নমনে গাছের পাতা পর্যন্ত চিবিয়ে খেয়েছো। কচিকন্ঠের ক্রন্দন, বৃদ্ধের অস্ফুট বিলাপ, নারীর ভাষাহীন হাহাকারেও সত্যের পথে অবিচল থেকেছো শিলাদৃঢ় পাহাড়ের মত।
বিশ্বাস করো, স্মৃতিময় এই প্রতিটি স্থানেই আমার কল্পনার চোখ তোমাকে খুঁজে ফেরে আর দু’চোখের ঝর্ণা থেকে অবিরত পানি ঝরে। সকাল-সন্ধ্যা, দুপুর-রাত -প্রতিটি ক্ষণে তোমার স্মৃতি মন্থন করে হারিয়ে যাই শোকসাগরের অনন্ত গহীনে আর বিচ্ছেদানলে দগ্ধ হৃদয়ে অশ্রুপ্লাবিত বিতৃষ্ণ নেত্রে চেয়ে থাকি পশ্চিমের দিকে। মদিনার পানে।
আত্মার প্রিয়তম!
তোমার পিয়ারা উম্মত হয়েও আমরা এড়িয়েছি তোমার স্বর্ণালী আদর্শকে। হৃদয়বৃত্তির অন্ধ আবেগে, জীবনভোগের দুর্নিবার লিপ্সায় ঐশ্বর্য আর গরিমার কাছে বিকিয়েছি অল্প পয়সার আত্মাকে। আমাদের ক্ষমা করো প্রিয়তম! করুণানিষিক্ত করো
হযরাত!!
তোমার সম্মান-ইজ্জতে, মান-সম্ভ্রমে প্রাচ্য-শকুনদের করাল দন্ত-নখরের গরল ছোবল রুখতে পারিনি আজও। বিকৃত জ্ঞানপাপী, বিক্রীত পামরদের অভিশপ্ত লেখনির পাপ-পঙ্ক থেকে আজও উদ্ধার করতে পারিনি তোমার সুবিমল আদর্শকে। আমাদের ক্ষমা করো মহত্ত্বম! করুণানিষিক্ত করো হযরাত!!
নগণ্য নপুংসক নাস্তিকদের নগ্ননিগড় থেকে নির্মুক্ত করতে পারিনি তোমার নিপট নিরুপম চরিত্রকে। গুটিকয়েক ভেকধারীর বিষ-খঞ্জর থেকে নিরঞ্জিত রাখতে পারিনি চিরগৌরবের জয়ভেরী মুক্তির জিয়নকাঠি পবিত্র ইসলামকে। আমাদের ক্ষমা করো মহোত্তম! করুণানিষিক্ত করো হযরাত!!
নিরাকার নিষ্প্রতিম এক আল্লাহর দুর্জয় বিশ্বাস, প্রিয়নবীর প্রেম-সুধার অন্তহীন ফল্গুধারা বাহিত চিত্তের নিদারুণ অভাবে সুখের সৌধে বিলাসপ্রিয় নিদ্রালু এই আমরা -মুসলিম জাতি আজ জলবুদ্বুদে পরিণত। আমাদের অগ্রে শোণিতাক্ত যুদ্ধের ময়দান, পশ্চাতে প্রেত-ছায়া, জিঞ্জির-জিন্দান। আমাদের ক্ষমা করো সর্বোত্তম! করুণানিষিক্ত করো হযরাত!!
করিলে অত্যুন্নতি তব পূর্ণতায়
নাশিলে তমোরাশি সৌন্দর্যপ্রভায়
মনোহর, আহা! তব কার্য সমুদয়
দরূদ পাঠাই সবে তব আত্মায়।
লেখক: কেফায়তুল্লাহ বিন সাইফ

Leave a Comment

Your email address will not be published.